নিজস্ব প্রতিবেদন:
মেহেরপুর সদর উপজেলার বামনপাড়া গ্রামে মীর গোলাম ফারুক, তাঁর ভাই ও ভাতিজাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চক্রের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তোলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালতের রায় ও দেশের আইন-আদালত অমান্য করে এই চক্রটি একের পর এক সম্পত্তি দখল ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯২৭ সালে কাজী রেজাউল হক ৯৪ শতক জমির ওপর ‘বামনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে কাজী মোজাম্মেল হক, কাজী সিরাজুল হক ও কাজী নজরুল ইসলাম কাগজে-কলমে বিদ্যালয়ের নামে ৮৫ শতক জমি দান করেন। ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ডে ওই ৮৫ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামেই রেকর্ডভুক্ত হয়।
অবশিষ্ট ৯ শতক জমির মধ্যে ৩ শতক জমি ঈদগাহের নামে দান করা হয়। বাকি ৬ শতক জমির নকশাগত ভুলত্রুটি সংশোধনীর জন্য ২০০৭ সালে জমির মূল মালিকগণ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে মেহেরপুর সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। শুনানির যুক্তিতর্ক শেষে আদালত বাদীগণদের পক্ষে অনুকূলে রায় দেন। বিবাদীপক্ষ জেলা জজ কোর্টে আপিল করলে ২০১৮ সালে আদালত পূর্বের রায় বহাল রাখেন। রায় পাওয়ার পর ২০১৮ সাল ৬ শতক জমির মালিকপক্ষ সেখানে একতলা পাকা মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন।
অভিযোগ ওঠে, বিগত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখের মার্কেটের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু করলে ফারুক বাহিনীর প্রধান মীর গোলাম ফারুক, মারুফ, শান্ত, সাহেব ও আনসারসহ ৫ জন ব্যক্তি ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে কাজ বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় মার্কেটের অন্যতম মালিক কাজী নজরুল ইসলাম বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মেহেরপুর সদর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশ এজাহারটি মামলা (এফআইআর) হিসেবে নথিভুক্ত করেনি।
স্থানীয়রা জানান, ফারুক বাহিনী বামনপাড়ার আরও একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে। অপপ্রভাবের ভয়ে হয়তো কেউ কেউ গোপনে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করছেন, আবার কেউ চাঁদা না দিয়ে তাঁদের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে ফারুক বাহিনীর বিরুদ্ধে আরও নানা অনিয়ম ও প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে। ফারুকের ভাই মীর আসাদুল বামনপাড়া জামে মসজিদের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় আদালতে মামলা বিচারাধীন একটি বিরোধপূর্ণ জমি মসজিদের কাছে বিক্রির নামে ফারুক ও আসাদুল দুই ভাই মিলে ৮ লাখ টাকা আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে মসজিদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাদের অপকার্মেল প্রতিবাদ করেন পরবর্তীতে তাঁকে বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনকে দিয়ে ‘সমীর হাজীর বাড়ি পোড়ানো’ সংক্রান্ত একটি ঝুলে থাকা (পেন্ডিং) মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া বামনপাড়ার একাধিক রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের তালিকা তৈরি করে পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে অর্থ বাণিজ্যের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
অন্য এক ঘটনায় জানা যায়, ফারুকের বাবা মোকসেদ আলী তাঁর আপন বোন সূরাতুন্নেসার কাছে ৫০ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন। সূরাতুন্নেসা ১৯৮৭ সালে সেই কেনা জমি মোঃ জলিল খান ও তাঁর স্ত্রীর কাছে বিক্রি করেন। তবে ভুলবশত এসএ রেকর্ডে জমিটি ফারুকের বাবার নামে উঠে এলে জলিল খান মেহেরপুর আদালতে রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেন। এর কিছুদিন পর ফারুক গং একটি বাটোয়ারা (পার্টিশন) মামলা দায়ের করে। মামলার চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই তারা জমিটি জোরপূর্বক দখলে নেয়।
এছাড়া বামনপাড়ার মধু খাঁর ছেলে গফুর খাঁর ৪০-৫০ শতক জমি এবং শুকুর মীরের ছেলে মীর মুলুকের ৪০-৫৫ শতক জমি দেশের আইন-কানুন কে তোয়াক্কা না করে ফারুক বাহিনী জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সূত্রে জানা যায়।
আইন লঙ্ঘন ও সরকারি সম্পত্তি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে। বামনপাড়া গ্রামের শেখপাড়ায় প্রায় ৪০ শতক সরকারি খাসজমি দীর্ঘদিন ধরে সিরাজ খাঁর দখলে ছিল এই জমি নিয়ে কোর্টে এখনো সরকারের সাথে মামলা চলমান আছে সিরাজ খান মৃত্যুবরণ করার পর তার দুই ছেলে খালেক ও মালেক মামলা চালিয়ে যাচ্ছি। অভিযোগ উঠেছে, ফারুক বাহিনী ওই সরকারি খাসজমিও নিজেদের দখলে নিয়ে ৮ থেকে ১০টি পরিবারের কাছে বিক্রয় করে দিয়েছে। অভিযুক্ত ফারুকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার বামনপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন তার ব্যক্তিগত অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি ব্যক্তিগত মোবাইলে কথা বলে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করলে সে মোবাইল ধরেননি।
এলাকাবাসী ফারুক বাহিনীর এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও অবৈধ জমি দখলের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।