গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি:
অশিক্ষিত, ভন্ড ও চতুর এক প্রতারকের রাজনৈতিক উত্থান এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা। তিনি আর কেউ নন, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র দীপক মন্ডল। কখনো মানবপাচারকারী (দালাল), কখনো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, আর বর্তমান পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি বনে গেছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার এই নাটকীয় ভোলবদল ও ধারাবাহিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এলাকার সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে নানাবিধ প্রশ্ন।
দীপক মন্ডলের ক্ষমতার দাপটে এলাকায় এক অলিখিত ভীতি বিরাজ করছে। তার সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে ভয়ে কেউ সহজে মুখ খুলতে রাজি হন না। পরবর্তীতে নাম ও ছবি প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দীপক মন্ডলের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল মূলত মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের মাধ্যমে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে লোক পাচার করাই ছিল তার মূল পেশা।
স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও প্রতিবারই রাজনৈতিক প্রভাবে সেগুলো ধামাচাপা পড়ে গেছে।
মানব পাচার চক্র থেকে বেরিয়ে এসে দীপক মন্ডল বেছে নেন রাজনীতির ছাতা। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করেন। বাগিয়ে নেন ২ নং ওয়ার্ডের সহ-সভাপতির পদ। এই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে সরকারি টিউবওয়েল দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়া, এমনকি পুলিশের ভয় দেখিয়ে দেদারসে চাঁদাবাজি শুরু করেন।
প্রভাবের জোরেই তিনি স্থানীয়‘গুয়াধানা সিলনা উচ্চ বিদ্যালয়’-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য পদ বাগিয়ে নেন। এরপর শুরু হয় তার কোটি টাকার ‘নিয়োগ বাণিজ্য’। জানা গেছে, এই বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি প্রায় ৭০-৮০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুয়াধানা গ্রামের এক ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাকে স্কুলে চাকরি দেওয়ার কথা বলে দীপক মন্ডল ২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নেয়। আজ পর্যন্ত আমি চাকরিও পাইনি, টাকাও ফেরত পাইনি দলের প্রভাব থাকায় তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাইনি।”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে খোলস পরিবর্তনের চমৎকারী দেখিয়েছেন দীপক মন্ডল। আদর্শের কোনো বালাই না রেখে,কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে গত ২৪/০৬/ ২০২৫ তারিখের গোপালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সম্মেলনে তিনি নাটকীয়ভাবে হাজির হন। আওয়ামী লীগের পদ থেকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ না করেই, এক অদৃশ্য জাদুবলে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদটি বাগিয়ে নেন।
বিএনপির পদ পাওয়ার পর দীপক মন্ডলের রূপ যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। নতুন পরিচয় ব্যবহার করে তিনি আবারও এলাকায় চাঁদাবাজি এবং সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেছেন। এর ফলে গোপালপুর ইউনিয়নের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক চরম নেতিবাচক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
নীতিহীন, সুযোগসন্ধানী ও চাঁদাবাজ এই দীপক মন্ডলের অত্যাচার থেকে বাঁচতে এবং গোপালপুর ইউনিয়নে রাজনৈতিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে এখন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ইউনিয়নবাসী।