স্টাফ রিপোর্টার – গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক প্রকৌশলীর বিপুল সম্পদের তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক ও বর্তমান প্রকৌশলীরা টেন্ডার মাফিয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এসব অর্থের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তারা।
দুদকের সূত্রে জানা গেছে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত দল গঠন করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এবার নতুন পরিস্থিতিতে যদি দুদক ‘ম্যানেজ’ না হয় তবে অন্তত এক ডজন প্রকৌশলী আইনের আওতায় আসতে পারেন। ইতোমধ্যে দুর্নীতির দায়ে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
দুদকের নথিতে দেখা যায়, যেসব প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে, তারা সবাই টেন্ডার মাফিয়া চক্রের সঙ্গে যুক্ত। গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত জিকে শামীম, প্লট বাণিজ্যের সাথে জড়িত গোল্ডেন মনির, এবং বালিশকাণ্ডের শাহাদত হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার সিন্ডিকেট পরিচালনা, বদলি বাণিজ্য এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রীরা। রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে কেনাকাটা দুর্নীতি এবং বালিশকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব ছিলেন শ ম রেজাউল করিম। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও। তারা একাধিক ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছেন যা দুর্নীতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যেসব প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে তাদের মধ্যে রয়ে ছেন- সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার,সাবেক প্রধান প্রকৌশ লী মো. রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম, তত্ত্বাবধা য়ক প্রকৌশলী আলমাস উদ্দিন,সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ, নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রি, সাইফুজ্জামান চুন্নু, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আলমগীর, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান, স্বর্ণেন্দু শেখর এবং আরো অনেকে।
দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজি জী গণমাধ্যম কে জানিয়েছেন,সরকারি দপ্তরগুলোকে দুর্নীতিমু ক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।তিনি জানান,সরকারি বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছেসর কারি প্রকল্পে টেন্ডার দুর্নীতি,প্লট ও ফ্ল্যাট বাণিজ্য,বৈদেশিকমুদ্রা পাচার, অস্বাভাবিক দর নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ। শহীদ উল্লা খন্দকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে,তিনি পরি বারের সদস্যদের নামে রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে তা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম এবং শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধেও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। মোসলেহ উদ্দিন, যিনি ‘মিস্টার ১৫%’ নামে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একাধিক প্রকৌশলী নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। বিশেষ করে রূপপুর বালিশকাণ্ড এবং নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের নির্মাণ কাজে দুর্নীতির বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০১৯-২০ সালে দুদক তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করলেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি নতুন অনুসন্ধান সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন প্রভাবমুক্তভাবে প্রকাশ করা হলে অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে অনুসন্ধানের গতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তা কতটা কার্যকর হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।