September 24, 2026, 7:58 pm
শিরোনামঃ
গাঁজা নীতি পুনর্বিবেচনার সময় কি এসেছে? নরসিংদীর পুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ এর বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্ভোধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ ও পাসপোর্টে নতুন নিয়ম চালু শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকার বারবার দরকার ময়মনসিংহের ওসি’র বিশেষ অভিযানে আটানি পুকুর পাড় এলাকার কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী লিটু গ্রেফতার নরসিংদীর শিবপুরে ৩ মাদক ব্যাবসায়ী গ্ৰেফতার আনন্দমোহন বসুকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে : ওয়াহাব আকন্দ এমপি নবনিযুক্ত পুলিশ সুপারের যোগদান ও মতবিনিময় সভা জামালপুরে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা ও সদর থানার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন ডিআইজি, পটিয়ায় ঢাকাগামী ট্রেনের ধাক্কায় কর্ভাটভ্যান দ্বিখন্ডিত।আটকা পড়ে ১৮শ পর্যটক।
নোটিশঃ
আপনার আশেপাশের ঘটে যাওয়া খবর এবং আপনার ব্যবসার বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন মানবাধিকার খবরে।

গাঁজা নীতি পুনর্বিবেচনার সময় কি এসেছে?

Reporter Name

নওগাঁর ঐতিহাসিক চাষ থেকে কানাডা-উরুগুয়ের অভিজ্ঞতা—নিয়ন্ত্রিত বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশে নীতিগত আলোচনার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গাঁজা—একদিকে মাদক ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত বিষয়, অন্যদিকে বিশ্বের কয়েকটি দেশে এটি এখন কঠোর নিয়ন্ত্রণের অধীনে একটি বৈধ অর্থনৈতিক খাত। আন্তর্জাতিক এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও গাঁজা নিয়ে প্রচলিত নীতি, সম্ভাব্য রাজস্ব, কৃষি অর্থনীতি, চিকিৎসা ও গবেষণা এবং অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কানাডা, উরুগুয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৮টি অঙ্গরাজ্য/অঞ্চলে অ-চিকিৎসাগত গাঁজার চাষ, উৎপাদন ও বিক্রির জন্য বিভিন্ন ধরনের আইনি ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। তবে প্রতিটি দেশের মডেল এক নয়; কোথাও বেসরকারি শিল্প, কোথাও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং কোথাও সীমিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার পরিচালিত হচ্ছে।

রাজস্বের সম্ভাবনা: কানাডার অভিজ্ঞতা

কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটিতে বৈধ গাঁজা বিক্রি ২০২৪/২৫ অর্থবছরে ৫.৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারগুলো গাঁজা বিক্রি থেকে ২.৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার রাজস্ব পেয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো দেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈধ বাজার তৈরি করা হলে সরকার কর ও অন্যান্য রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে বৈধ ব্যবসার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তবে কানাডার পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্বের সরাসরি হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, আইন, ভোগের ধরন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ভিন্ন।

নওগাঁর ইতিহাসেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নজির

গাঁজা বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিষয় নয়। নওগাঁ জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর ও বদলগাছী এলাকায় ব্যাপকভাবে গাঁজা চাষ হতো। একসময় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমি গাঁজা চাষের আওতায় ছিল।

সরকারি ঐতিহাসিক তথ্যে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার নওগাঁর গাঁজা উৎপাদকদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টাকা রাজস্ব পেত। নওগাঁর গাঁজা সোসাইটিও স্থানীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল বলে জেলা প্রশাসনের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ ইতিহাসের একটি পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে গাঁজা চাষ কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার অংশ ছিল। বর্তমান সময়ের নীতি নির্ধারণে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা গবেষণার একটি বিষয় হতে পারে।

অবৈধ বাজারের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত বাজার?

বাংলাদেশে বর্তমানে অনুমোদন ছাড়া গাঁজা বা সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদের চাষ, উৎপাদন, বহন, পরিবহন, আমদানি ও রপ্তানি আইনত নিষিদ্ধ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৯ ধারায় এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে নীতিগত আলোচনার জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি কোনো দেশে গাঁজার চাহিদা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেও অবৈধ বাজার সৃষ্টি হয়, তাহলে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে সীমিত বৈধ বাজার চালু করলে সেই অর্থনীতির একটি অংশকে কি করের আওতায় আনা সম্ভব?

এ ধরনের ব্যবস্থায় উৎপাদন ও বিক্রির লাইসেন্স, বয়সসীমা, পণ্যের মান ও THC মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, কর এবং কঠোর শাস্তির মতো ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

উরুগুয়ের মডেলও আলোচনায়

উরুগুয়ে ২০১৩ সালে গাঁজার অ-চিকিৎসাগত, চিকিৎসা ও শিল্প ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো চালু করে। দেশটির ২০২৬ সালের সরকারি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে গাঁজার ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রচলিত সরবরাহের ৫৮ শতাংশ যেখানে অবৈধ বাজার থেকে আসত, ২০২৪ সালে তা ৬.৭ শতাংশে নেমে আসে। একই মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ব্যবহারকারীদের ৪৬ শতাংশ বৈধ বাজারের কোনো একটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এটি অবশ্য বাংলাদেশের জন্য কোনো সরাসরি মডেল বা ফলাফলের নিশ্চয়তা নয়। বরং দেখায়, রাষ্ট্র চাইলে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে সম্ভাব্য গবেষণার ক্ষেত্র

বাংলাদেশে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গবেষণা করা যেতে পারে—

১. রাজস্ব: লাইসেন্স ও করের মাধ্যমে সম্ভাব্য সরকারি রাজস্ব কত হতে পারে।

২. কৃষি: উপযুক্ত এলাকায় অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত শিল্পভিত্তিক চাষের সম্ভাবনা আছে কি না।

৩. কর্মসংস্থান: কৃষি, গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈধ ব্যবসায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে কি না।

৪. চিকিৎসা ও গবেষণা: গাঁজার নির্দিষ্ট উপাদান নিয়ে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সম্ভাবনা।

৫. সীমান্ত চোরাচালান: নিয়ন্ত্রিত বৈধ বাজার অবৈধ সরবরাহের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

৬. জনস্বাস্থ্য: আসক্তি, কিশোরদের ব্যবহার, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

বৈধতা মানেই অবাধ সেবন নয়

গাঁজা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘বৈধতা’ ও ‘অবাধ ব্যবহার’ এক বিষয় নয়।

বিশ্বের যেসব দেশে গাঁজার কোনো না কোনো বৈধ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও বয়সসীমা, উৎপাদন লাইসেন্স, বিক্রির নিয়ম, পণ্যের মান, কর এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো বিধিনিষেধ থাকতে পারে। UNODC-ও বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের কথা জানিয়েছে এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত ও ঘন ঘন ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

শেষ কথা

বাংলাদেশে গাঁজা বৈধ করা হবে কি না—এটি শেষ পর্যন্ত আইন ও নীতিনির্ধারণের বিষয়। কিন্তু নওগাঁর ঐতিহাসিক গাঁজা চাষ, বর্তমান অবৈধ বাজার, আন্তর্জাতিক নীতির পরিবর্তন এবং কানাডার রাজস্ব অভিজ্ঞতা—সবকিছু সামনে রেখে বিষয়টি নিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় আলোচনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

একদিকে জনস্বাস্থ্য ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে কৃষি, গবেষণা, অর্থনীতি ও রাজস্ব—দুই দিক বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রশ্নটি তাই শুধু ‘গাঁজা বৈধ হবে কি না’ নয়; বরং প্রশ্ন হতে পারে—কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশ এ বিষয়ে কোনো নতুন নীতি নিয়ে গবেষণা করবে কি না।



Our Like Page
Developed by: BD IT HOST