স্টাফ রিপোর্টার |মোঃ শাহীন হোসেন
খুলনা:১৮ এপ্রিল ২০২৬
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় সারা দেশে দৈনিক গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে বলে জানা গেছে।
বিশেষ করে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। গরম আবহাওয়া, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ায় জনমনে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে।
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল ও গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার আগের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না।
ফলে—
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না
ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল চালিত কেন্দ্রগুলো সীমিতভাবে চলছে
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩০–৪০ শতাংশে পৌঁছেছে
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই আমদানি নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই সরাসরি দেশীয় উৎপাদনে ধাক্কা লাগে।”
দৈনিক ৮–৯ ঘণ্টা লোডশেডিং
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা চলছে। কোথাও কোথাও এটি ১০ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী লোডশেডিং করা হলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল। অনেক এলাকায় কোনো নির্দিষ্ট সময় ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
খুলনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
খুলনা মহানগর ও আশপাশের জেলাগুলোতে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না। গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি কষ্ট পাচ্ছে। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ঘর অন্ধকার ও গরম হয়ে যায়।”
ছাত্রছাত্রীরাও পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছে। পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইন ক্লাস ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ধস
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস এবং ছোট-মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন—
প্রতিদিন উৎপাদন ২০–৩০% কমে গেছে
সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি করা কঠিন হয়ে পড়েছে
জেনারেটর চালাতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে
অনেক কারখানা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে
একজন গার্মেন্টস মালিক বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন লাইনে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ক্ষতি হচ্ছে।”
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় প্রভাব
গ্রামাঞ্চলে সেচ নির্ভর কৃষি কার্যক্রমও লোডশেডিংয়ের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ডিজেল চালিত পাম্পের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক সেচ দিতে পারছেন না।
ফলে—
ধান ও সবজির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে
ফসল শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে
কৃষি খরচ বেড়ে যাচ্ছে
একজন কৃষক জানান, “বিদ্যুৎ না থাকলে পাম্প চলে না, আর ডিজেল চালাতে গেলে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়।”
হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবায় সংকট
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালগুলোতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। জেনারেটর থাকলেও দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
অপারেশন থিয়েটারে সমস্যা
পরীক্ষাগারগুলোতে বিলম্ব
জরুরি সেবায় বিঘ্ন
একজন চিকিৎসক বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়, যা রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
নাগরিক জীবনে সবচেয়ে বড় ভোগান্তি তৈরি হয়েছে তাপমাত্রা ও অস্বস্তির কারণে। ফ্যান, এসি, পানির পাম্প সবই বিদ্যুৎ নির্ভর হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছে।
মানুষের অভিযোগ—
রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে
পানির সংকট দেখা দিচ্ছে
মোবাইল চার্জ ও ইন্টারনেট সমস্যা
শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
সরকারের বক্তব্য
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সাময়িক এবং আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হলে সংকট কমে আসবে।
তারা বলছেন—
নতুন জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে
কিছু নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে
লোডশেডিং ধীরে ধীরে কমানো হবে
তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
অর্থনীতিতে প্রভাব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই বিদ্যুৎ সংকট দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
উৎপাদন কমে রপ্তানি আয় হ্রাস
শিল্পে বিনিয়োগে অনীহা
বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা
মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি
এক অর্থনীতিবিদ বলেন, “বিদ্যুৎ হলো অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এটি দুর্বল হলে পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।”
নাগরিক প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ লোডশেডিং নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। অনেকে বলছেন, নির্দিষ্ট শিডিউল না থাকায় জীবনযাত্রা অস্থির হয়ে পড়েছে।
কেউ কেউ দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন, আবার অনেকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন।
সম্ভাব্য সমাধান
বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশ দিয়েছেন—
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো
গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার
জ্বালানি অপচয় রোধ করা
শিল্পখাতে নির্ধারিত লোড ম্যানেজমেন্ট
উপসংহার।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। এর ফলাফল হিসেবে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে, যা জনজীবন, শিল্প, কৃষি এবং অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে।
খুলনাসহ সারা দেশের মানুষ এখন একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রত্যাশায় রয়েছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খুলনা অফিস
০১৯৭০-১২৫০৬০