মোঃ সেলিম : খাদ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদার মোঃ সোহাগের বিরুদ্ধে সরকারি গম সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার, বিভিন্ন মিলের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া, সরকারি গম ও আটা সরবরাহে অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (NSI) একটি বিশেষ প্রতিবেদনে।
“খাদ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদার মোঃ সোহাগ এর একচ্ছত্র আধিপত্য ও দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষ প্রতিবেদন” শিরোনামে তৈরি ওই প্রতিবেদনটি NSI-এর মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনের প্রথম পাতায় তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার-এর কাছে এটি পাঠানোর তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে চার পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদন সংযুক্ত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
NSI-এর প্রতিবেদনে মোঃ সোহাগের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের সরকারি গম বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন জেলার মিলের মাধ্যমে সরকারি গম/আটা সরবরাহের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও মিল মালিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের বিষয়েও প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
সরকারি গমের বরাদ্দ ও সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনের একটি অংশে সরকারি গমের বরাদ্দ, মিল নির্বাচন এবং সরকারি গম থেকে আটা উৎপাদন ও সরবরাহের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
NSI-এর প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে বিভিন্ন মিলকে গম বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি গম নির্ধারিত মিলের পরিবর্তে অন্য মিলের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি গমের একটি অংশ ওএমএস ডিলারদের কাছে সরবরাহের পর তা বাজারে চলে যাওয়ার অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তালিকা
NSI প্রতিবেদনে মোঃ সোহাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তার প্রভাবাধীন বলে উল্লেখ করা বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ঢাকা ও নরসিংদী এলাকার বিভিন্ন ফ্লাওয়ার মিল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
প্রতিবেদনে তার সম্পদ, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়েও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।NSI-এর সুপারিশ কী ছিল?প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর “সুপারিশ”
সেখানে মোঃ সোহাগের সম্পত্তির বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মিলের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি গমের অপব্যবহার হয়েছে কি না এবং গম সরবরাহের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি গমের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারি খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।তাহলে তদন্ত হলো কি?এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপনীয় বিশেষ প্রতিবেদনে যখন একজন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে, তখন পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে—তা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সরকারি গমের বরাদ্দ ও সরবরাহের নথি যাচাই করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের বর্তমান অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে NSI প্রতিবেদনে যেসব বিষয়ে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি কী—তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।জনস্বার্থে তদন্তের দাবি”
সরকারি খাদ্যশস্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ফলে NSI-এর প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র উপায় হলো নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই সরকারি অবস্থান প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
ছবি : সংগৃহীত