প্রথম বাংলা ; জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আসেন, সেই আদালতপাড়াতেই এবার এক নারী ও এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণ ও অপহরণ মামলার শুনানি শেষে বাড়ি ফেরার পথে আদালতের মূল ফটকসংলগ্ন ঈদগাহ চত্বরের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন মারামারির অভিযোগ নয়; বরং আদালত প্রাঙ্গণে বিচারপ্রার্থী নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে হাতাহাতির দৃশ্য
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আদালত ভবন সংলগ্ন এলাকায় এক নারীর সঙ্গে দুই ব্যক্তির হাতাহাতির দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে ঐ দুই ব্যক্তিকে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মহুরি মোঃ আমিনুল ইসলাম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির পরিচয়, ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট, হামলার কারণ এবং ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত মোঃ আমিনুল ইসলামের বক্তব্যও জানা জরুরি।
দুই লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি
ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত পাড়ায় দুই লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগকারীর দাবি, ঘটনাস্থলে কথাকাটাকাটির সময় ঘুষের লেনদেনসংক্রান্ত কথাবার্তাও উঠে আসে।
তবে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে এই মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্ত ছাড়া সত্য হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই।
অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
থানায় যাওয়ার পর ‘ধামাচাপা’র চেষ্টা উঠছে গুরুতর অভিযোগ
এদিকে স্থানীয় সূত্রের বরাতে আরও অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর বিষয়টি থানায় পৌঁছালে মহুরি মোঃ আমিনুল ইসলামের পরিচিত বা তার পক্ষের কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট থানার পক্ষ থেকে নিশ্চিত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে ঘটনাটি যদি নিছক একটি সাধারণ হাতাহাতির ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে এত আলোচনা কেন? আর যদি কোনো পক্ষ সত্যিই ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সেই চেষ্টা কারা করছেন এবং কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
‘মহুরীর হাত অনেক শক্তিশালী’ আদালতপাড়ায় এমন আলোচনা কেন?
স্থানীয়ভাবে আরও আলোচনা রয়েছে, সংশ্লিষ্ট মহুরি মোঃ আমিনুল ইসলামের আদালতপাড়ায় যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন মহলে ‘মহুরীর হাত অনেক শক্তিশালী’ এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে।
তাই তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার অভিযোগকারী থানায় গেলে কোনো চাপ, প্রভাব বা আপসের চেষ্টা হয়েছিল কি না; কোনো পক্ষকে মামলা বা অভিযোগ থেকে সরে আসতে বলা হয়েছিল কি না; কিংবা ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না।
বাসা নিয়েও তথ্য, প্রয়োজন যাচাই
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোঃ আমিনুল ইসলামের বাসা জামালপুর শহরের বেলটিয়া পুলিশ লাইনের পাশের খোপীবাড়ী এলাকায়।
তবে ঠিকানা-সংক্রান্ত এ তথ্যও সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রয়োজনীয় নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আদালত যদি নিরাপদ না হয়, বিচারপ্রার্থী যাবে কোথায়?
আদালত সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। একজন নারী, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থী যদি আদালত প্রাঙ্গণেই হামলা, ভয়ভীতি বা হয়রানির শিকার হন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এ ঘটনার ক্ষেত্রে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির মূল উৎস, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, থানায় করা অভিযোগ বা জিডি এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথি যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত আইনজীবী, মহুরি, আদালতকর্মী, পুলিশ সদস্য ও সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও নেওয়া উচিত।
মহুরিদের পেশাগত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
আদালতে আইনজীবীর সহকারী বা মহুরিদের ভূমিকা বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই তাদের পরিচয়, পেশাগত অনুমোদন, দায়িত্ব ও আচরণবিধি যথাযথভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
কোনো মহুরি যদি নিজের পেশাগত পরিচয় বা আদালতকেন্দ্রিক যোগাযোগকে ব্যবহার করে বিচারপ্রার্থীকে প্রভাবিত, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা কোনো অনৈতিক লেনদেনে জড়িত হন তাহলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আইন সবার জন্য সমান
বাদী কিংবা বিবাদী, নারী কিংবা পুরুষ, প্রতিবন্ধী কিংবা সাধারণ নাগরিক আদালত প্রাঙ্গণে প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকেও হয়রানি করা যাবে না।
কারও পদ, পরিচয়, পেশাগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাব যেন তদন্তের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এটাই আইনের শাসনের মৌলিক দাবি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
জামালপুর আদালতপাড়ায় ঘটে যাওয়া অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। হামলার প্রকৃত ঘটনা কী, কারা জড়িত, ঘুষের অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না, থানায় যাওয়ার পর কোনো পক্ষ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে কি না সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
Bangla Times 24 মনে করে, আদালত প্রাঙ্গণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের জায়গা নয়; এটি ন্যায়বিচারের জায়গা। এখানে সত্য প্রকাশের পথ যতটা স্বচ্ছ হবে, বিচার প্রার্থীদের আস্থাও ততটাই শক্তিশালী হবে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হোক অপরাধীBangla Times 24 হলে শাস্তি হোক, নির্দোষ হলে তিনি মুক্ত থাকুন। কিন্তু কোনো প্রভাবশালী পরিচয় যেন সত্য অনুসন্ধানের পথে ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়।
Bangla Times 24-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত মোঃ আমিনুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সুত্র, Bangla Times 24