নিজস্ব প্রতিবেদন: জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সম্ভাব্য ঢাকা সফরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
এমন এক সময়ে এই সফর হতে যাচ্ছে,যখন দেশের ভেতরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা চলছে এবং একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ও তা ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।Dictionaries & Encyclopedias
অনেক বিশ্লেষকের মতে,এই সফর কেবল একটি নিয়মিত কূট নৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন—এমন আলোচনা মূলত ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজ নৈতিক বিশ্লেষকদের পোস্ট,মন্তব্য ও অনানুষ্ঠানিকআলোচনার সূত্র ধরে ছড়িয়ে পড়েছে।এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি ফলে বিষয়টি বর্তমানে রাজনৈতিক গুঞ্জনের পর্যায়েই রয়েছে; নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।Language Resources
অন্যদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া এবং দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সার্জিও গোরের সফরকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বিদেশ সফর শেষে দেশে ফেরার পর তার সঙ্গে বৈঠকের সময়সূচি মিলিয়েই সার্জিও গোরের কর্মসূচি চূড়ান্ত হতে পারে। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকও থাকতে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের সম্ভাবনার কথা কূটনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও সফরের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।Politics
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সার্জিও গোর দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ও হোয়াইট হাউসে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার ঢাকা সফরকে শুধু দূতাবাস পর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটি হোয়াইট হাউসের সরাসরি কৌশলগত আগ্রহের প্রতিফলন।
ওয়াশিংটন সাধারণত বিশেষ দূত পাঠায় তখনই, যখন কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভূমিকা বা পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সে কারণে অনেক সাবেক কূটনীতিক মনে করছেন, বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কার্যক্রম মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।Geographic Reference
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর। ওই সফরে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, তিস্তা নদী উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ একাধিক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়,আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকে রা এসব উদ্যোগকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতির অংশ হিসেবেও দেখছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বন্দর, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে ঘিরে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।Writers Resources
একই ধরনের মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই নিজেদের সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক সংযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে।
এই সফরে চীন-সংক্রান্ত বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প, মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য সামরিক ক্রয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিস্তারিত জানতে চাইতে পারে।
নিক্কেই এশিয়ার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রবন্দরগুলো এখন কেবল বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়; বরং সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এসব প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ওয়াশিংটনের বিশেষ নজরে রয়েছে।Executive Branch
তিস্তা প্রকল্প নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ থাকার কারণ রয়েছে। ভারতের সংবাদপত্র দ্য হিন্দু এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তিস্তা শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি ভারত-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও আলোচনার অন্যতম বিষয় হতে পারে। সার্জিও গোর একই সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হওয়ায় দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক,সীমান্ত নিরাপত্তা,বাণিজ্য,যোগাযোগ উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তার আগ্রহ স্বাভাবিক।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলেছে, বাংলাদেশ এখন আর ভারত অথবা চীনের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে না; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বুঝতে চাইবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।Government
রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও আলোচনায় আসতে পারে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মস্কো সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ঢাকা-মস্কো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও ওয়াশিংটনের আগ্রহ থাকতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স এবং আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রত্যাবাসন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোও নতুন সংকটের মুখে পড়ছে।Dictionaries & Encyclopedias
এদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কও যুক্তরাষ্ট্রের নজরে রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফর এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা, একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ—এসব বিষয়ও বৈঠকে উঠে আসতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতাও আলোচনার বড় একটি অংশ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, আধা-পরিবাহী শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
তবে এই সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আলোচনা হচ্ছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। তিনি সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরে আদালতে হাজির হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেছেন। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।Journalism & News Industry
কূটনৈতিক মহলে এমন ধারণাও রয়েছে যে, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে মূল্যায়ন করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে নিয়ে কোনো নতুন নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করেনি। ফলে সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়ে যেসব আলোচনা চলছে, সেগুলো এখনো মূলত বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক মহলের মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। অর্থাৎ একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা ও যোগাযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ঢাকা।Language Resources
এই ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হোক। চীন চাইবে তার বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাক। ভারত চাইবে তার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকুক। অন্যদিকে রাশিয়া বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বহুমাত্রিক বাস্তবতার মধ্যেই সার্জিও গোরের সম্ভাব্য ঢাকা সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে হয়তো আলোচনায় থাকবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। কিন্তু কূটনৈতিক মহলের ধারণা, পর্দার আড়ালে চীন, ভারত, রাশিয়া, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য প্রভাব এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাবে। সফরের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে, কিন্তু আগামী সময়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে এই সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।