মোঃ সেলিম – ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক হাবিবুল্লাহকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতি,আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্যশস্যের ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং ইউনিয়ন পরিষদে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,“ওয়ান পার্সেন্ট প্রকল্প”-এর আও তায় প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের পরিকল্পনায় ছিল একটি পাকা বাথরুম নির্মাণ (ছাদসহ), পুরোনো স্যানিটারি ল্যাট্রিনে হাই-কমোড বসানো এবং বারান্দায় লোহার গ্রিল স্থাপন। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রকল্পের মূল কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৮২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভ্যাট ও অন্যান্য খাতে সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৪২ হাজার টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই অর্থ কোরবানির ঈদের আগে গরু কেনার কথা বলে নেওয়া হয়েছিল- যা নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ উত্তোলনের লক্ষ্যে আংশিক কিছু কাজ যেমন লোহার গ্রিল স্থাপন ও হাই-কমোড বসানো হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ পাকা বাথরুম এখনো নির্মাণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়নের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পেই প্রশাসক হাবিবুল্লাহ নিজেকে সভাপতি করার প্রবণতা দেখিয়েছেন, যা প্রচলিত প্রশাসনিক বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। জনপ্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের কাবিখা(কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচির একটি প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।জানা যায়,ল্যাংড়ার বাজার থেকে জলি ল খাঁর বাড়ি পর্যন্ত ৩৮৫ মিটার ইটের সোলিং নির্মাণের জন্য ৬.২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের প্রথম কিস্তি উত্তোলনের পরই প্রশাসক পুরো কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদের অন্যান্য প্রকল্পের টাকা দিয়ে আপাতত এই কাজটা শেষ করেছি। পরে এই প্রকল্পের বাকি বরাদ্দ তুলে অন্য প্রকল্পে কাজ করা হবে।”
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা(ATEO) মিতালি বণিক কিন্তু তার স্বাক্ষর জাল করে প্রশাসক নিজেই প্রকল্পটি বাস্ত বায়ন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রশাসক হাবিবুল্লাহ স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,“সভাপতির জাল স্বাক্ষরের পুরো দায় ভার আমার। তিনি এখন বদলি হয়ে গেছেন, তাই এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
আরও অভিযোগ রয়েছে,একটি প্রকল্পে স্থানীয় মেম্বার জলিলকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেখানে অর্থ লেনদেন নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। অন্যদিকে, আরেকটি প্রকল্পে এক নারী সদস্যকে সভাপতি করে তার কাছ থেকে কাজ না করিয়েই ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক ও সচিবের মধ্যেও প্রশা সনিক নির্দেশনা নিয়ে দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, ৩ জুলাই ২০০৬ সালের আগে কেউ মারা গেলে তার জন্য অনলাইন মৃত্যু সনদ বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু অভিযো গ রয়েছে,প্রশাসক হাবিবুল্লাহ ইউনিয়ন সচিবকে জোরপূর্ব ক ওই ধরনের মৃত্যু সনদ গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। সচিব বিষয়টি নিয়মবহির্ভূত উল্লেখ করে তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে দুজনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে প্রশাসকের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। জন্মনি বন্ধন, নাগরিক সনদ ও প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিতে এসে ইউনিয়নবাসীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসক হাবিবুল্লাহ বলেন, “আমি নতুন করে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বে রয়েছি। ফিলিং স্টেশনের হিসাব-নিকাশ ও তদারকির কাজ করতে গিয়ে সবসময় ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক সেবা কেন্দ্র। সেখানে দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার অনিয়মিত উপস্থিতি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রশাসক হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশি ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ একটি দৈনিক পত্রিকায় অতিদরিদ্র দের জন্য বরাদ্দ চাল আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ২৬ ফেব্রুয়ারি আরেকটি পত্রিকায় কাবিখা প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এদিকে সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আনিসুর রহমান অভিযোগ করেছেন,প্রশাসক হাবিবুল্লাহ তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মিথ্যা,ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অপপ্রচার চালাচ্ছেন এ ঘটনায় তিনি নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একাধিক গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ প্রকাশের পরও যদি যথাযথ তদন্ত ও ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকেই যাবে।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।