সেলিম মিয়া : রাজশাহী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (আরসিফুড) এর একটা ‘অঙ্গীকার নামা’ ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে লেখা রয়েছে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদাম গুলোতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদায়নে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা নিরসনে তিনি কোন বদলী বাণিজ্য করবেন না মর্মে অঙ্গীকার করছেন এবংএটিকে তিনি ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করে ছেন।গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ একটি ব্যতিক্রমী অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করেছেন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসিফু)এসএম কায়সার আলী।
অঙ্গীকার নামায় তিনি বলেন,ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদায়নে তিনি কোনো বদলি বাণিজ্য করবেন না এবং কাউকেও তা করতে দেবেন না। একই সঙ্গে পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা থেকে বেরি য়ে আসার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের বদলি নীতিমালা-২০১৯ (সংশোধিত-২০২২) অনুযায়ী পদায়নে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সহকর্মীদের সহযোগিতাও কামনা করেন। অঙ্গীকারনামার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যগুলোর একটি”একবার আস্থা রেখে দেখুন, হতাশ করব না।”এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সহকর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই অঙ্গীকার নামা ছড়িয়ে পড়লে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, উঠেছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়,বইছে মুখরুচোক নানা গুঞ্জন। অনেকে বলছে, এই অঙ্গীকার নামা সম্পূর্ণরূপে চাকরিবিধি পরিপন্থী।কারণ ব্যক্ত অঙ্গীকার তাঁর সরকারি দায়িত্ব।
এ জন্য নতুন করে অঙ্গীকার নামা প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। সাধারণত আমরা কোনো ভুল করলে কর্তৃপক্ষের নিকট অঙ্গীকার নামা দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতঃ দায়মুক্তি কামনা করি। তাঁর এই অঙ্গীকারনামা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি আগে এ ধরণের অপরাধ করেছেন অথবা তাঁর সহকর্মী বা অন্যান্য কর্মকর্তাগণ এ ধরণের অপরাধের সঙ্গে এখনো জড়িত আছেন।
অন্যদিকে খাদ্য বিভাগের একটি সুত্র বলছে, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযো গ মাধ্যমে(ফেসবুক) এগুলো প্রচার করতে পারেন না, ডাবল স্ট্যান্ডবাজি করা ঠিক নাকারণ তিনি প্রায় সাড়ে তিন বছর একনাগাড়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক থাকাকালে কি কি কাজকর্ম করেছেন তা চট্টগ্রাম বিভাগের খাদ্য পরিদর্শকেরা খুবই ভালোভাবেই জানে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খাদ্য পরিদর্শক জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে তার পরম সখ্যতা,প্রভাব বিস্তার, শুধুমাত্র চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের মতো লোভনীয় পদে অধিষ্ঠিত হওয়া র জন্যে নিজে পদোন্নতি না নিয়ে তার সিরিয়ালের পরেরজনকে পদোন্নতি দিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক করা,
খাদ্য অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা খর্ব করে এক নাগাড়ে সাড়ে চার বছরের অধিক সময় কুমিল্লা জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পদ কিভাবে দখলে রেখেছিলেন। তা কিন্তু সবার জানা।
এছাড়াও ইন্টেরিম সরকারের সময়ে আড়াই বছরের মাথায় তাকে খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে বদলী করা হলে সেটিকে তিনি ঠেকিয়ে দেন। চট্টগ্রাম বিভাগে সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন শেষে খুলনা বিভাগে বদলী হলে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার দিন এক সঙ্গে ১৪টি এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে পদায়ন করেন এবং পরবর্তীতে তৎকালীন খাদ্য সচিবের নির্দেশে তা আবার বাতিলও করেন। খুলনা বিভাগে কয়েক মাস দায়িত্ব পালন শেষে কিভাবে রাজশাহী বিভাগে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলী বাগিয়ে নেন তা নিয়েও খাদ্য বিভাগে গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিমত,এটা অঙ্গীকার নামা, না কি নিষ্ফল দাবি ? খাদ্য বিভাগের একজন উচ্ছ পদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অঙ্গীকারনামায় লিখলেন
“আমি কোনো বদলি বাণিজ্য করব না, কাউকেও করতে দেব না।”
কথাটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে তিনি বা তার দপ্তর কি এতোদিন এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন,না থাকলে অঙ্গীকার নামার প্রশ্ন আসছে কেন ?
আবার প্রশ্ন হলো শুধু কর্মকর্তা নিজে ঘুষ না নিলেই কি একটি দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ বদলি-পদায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয় ?
খাদ্য বিভাগের একাধিক সুত্র জানায়, ধরা যাক, কর্মকর্তা নিজে কোনো অর্থ নিলেন না। কিন্তু তাঁর জারি করা পদায়ন আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অধস্তন ব্যক্তি সংশ্লিষ্টদের কাছে অবৈধ অর্থ দাবি করেন, আর অর্থ না দিলে সেই আদেশের কার্যক্রম না এগোয় তাহলে সেই অঙ্গীকারের বাস্তব ফল কোথায় ? বিষয়টি অনেকটা এমন মহাজন যদি বলেন, “আমি কলা খাই না”; অথচ তাঁর পেয়াদা-সহকারীরা যদি কলা ছাড়া চলতেই না পারে, তাহলে মহাজনের “আমি কলা খাই না” দাবি কতটা অর্থবহ ? ঠিক তেমনি,
অন্যদিকে আমি ঘুষ নেব না” এই ব্যক্তিগত অঙ্গীকার একা যথেষ্ট নয়।
প্রকৃত অঙ্গীকার হওয়া উচিত ছিল
“আমার দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি বা পদায়নের নামে ঘুষ নিতে পারবে না। কেউ এ ধরনের অনিয়মে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বদলি-পদায়ন হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নীতিমালা ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায়।”
কারণ, একজন কর্মকর্তা নিজে ঘুষ না নিলেও তাঁর দপ্তরের অন্য কারও মাধ্যমে যদি একই অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে “ঘুষ নেব না” এই অঙ্গীকার বাস্তব পরিবর্তনের পরিবর্তে কেবল কাগজে লেখা একটি অঙ্গীকার হয়েই থেকে যেতে পারে।