অহমিকার অন্তরালে: মানুষ কেন অহংকার করে?
মহাবিশ্বের এক অনন্ত, কালহীন পটভূমিতে আমাদের এই চেনা পৃথিবী এক বিন্দুর চেয়েও ক্ষুদ্র। আর সেই বিন্দুর বুকে হেঁটে চলা মানুষের জীবন যেন এক মুহূর্তের জলছাপ। অথচ, এই নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী মানুষই বুকের ভেতর লালন করে এক আকাশচুম্বী দম্ভ, যার নাম ‘অহংকার’। বাহ্যিকভাবে অহংকারকে আমরা কেবলই এক নৈতিক স্খলন, উদ্ধত গ্রীবা কিংবা আধিপত্যের কুৎসিত প্রকাশ বলে জানি। কিন্তু যদি আমরা মানুষের মনের গহীনে, ইতিহাসের পাতায় আর দর্শনের আলোয় ডুব দিই, তবে দেখব—অহংকার আসলে মানুষের এক পরম আর্তি, এক গোপন কান্না এবং অস্তিত্বের শূন্যতা ঢাকার এক মরিয়া ছদ্মবেশ। মানুষ কেন অহংকার করে? এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে ভাষাতত্ত্বের শুষ্ক ব্যাকরণও একসময় কবিতার মতো রহস্যময় হয়ে ওঠে, মনস্তত্ত্ব আর দর্শনের সীমানা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
* ভাষার আয়নায় ‘আমি’র ব্যবচ্ছেদ
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘অহংকার’ শব্দটির জন্মই হয়েছে এক গভীর আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে। সংস্কৃত ‘অহম্’ (আমি) এবং ‘কার’ (রূপ দেওয়া) শব্দের মিলনে এই শব্দটির সৃষ্টি। এর আদিম ও অকৃত্রিম অর্থ ছিল কেবলই ‘আমা-পনা’—অর্থাৎ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া। গাছের যেমন গাছ-ত্ব আছে, নদীর যেমন নদী-ত্ব, মানুষের তেমনই ছিল ‘অহং’। কিন্তু কালক্রমে, মানুষের সমাজ যখন জটিল হলো, যখন কাড়াকাড়ি আর কেড়ে নেওয়ার যুগ এলো, তখন এই সহজ ‘আমি’ শব্দটির গায়ে এসে লাগল লোভ আর হিংসার বিষাক্ত প্রলেপ। নিজের স্বাভাবিক অস্তিত্বকে ছাড়িয়ে মানুষ যখন এক কাল্পনিক, অতি-স্ফীত ‘আমি’র মন্দির গড়ে তুলল, তখনই ভাষার সেই পবিত্র ‘অহম্’ রূপান্তরিত হলো অন্ধ ‘অহংকারে’। এটি যেন নিজের চারপাশের এক কৃত্রিম দেয়াল, যা মানুষকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে এক নিঃসঙ্গ চূড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
* মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত: শূন্যতার বুকে দম্ভের কারুকাজ
মনস্তত্ত্বের আলোয় অহংকার কোনো শক্তি নয়, বরং এটি মানুষের চরম দুর্বলতার এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে, মানুষের মন এক উত্তাল সমুদ্রের মতো, যেখানে অবদমিত আদিম ইচ্ছা ‘ইড’ এবং সামাজিক নীতিবোধ ‘সুপার-ইগো’র মধ্যে অহর্নিশ যুদ্ধ চলছে। এই দুইয়ের নোঙরহীন টালমাটাল অবস্থায় মানুষের ‘ইগো’ বা অহংবোধ যখন নিজেকে বড্ড অসহায় আর নগণ্য মনে করে, তখন সে এক কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের বর্ম পরিধান করে।
বাইরের সেই উদ্ধত প্রকাশ আসলে ভেতরের এক কম্পমান ভীতু শিশুর আত্মরক্ষার আকুল চেষ্টা।আলফ্রেড অ্যাডলার একে আরও চমৎকারভাবে বলেছেন ‘হীনম্মন্যতার ক্ষতিপূ রণ’ (Compensation for Inferiority)। যেসব মানুষ শৈশবে কিংবা অতীতে অবহেলা, প্রত্যাখ্যান বা তীব্র একাকীত্বের ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে, তাদের মনের ভেতর এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
সেই ক্ষতবিক্ষত শূন্যতাকে ঢাকতে তারা অবচেতনভাবেই অহংকারের এক জাঁকজমকপূর্ণ মুখোশ পরে নেয়। কার্ল ইয়ুং-এর ভাষায়, এটি মানুষের ‘পারসোনা’ বা সামাজিক মুখোশের এক অতি-স্ফীতি। মানুষ যখন তার ভেতরের আসল, রক্ত-মাংসের ও ভুলভ্রান্তিতে ঘেরা সত্তাকে ভুলে গিয়ে সমাজকে দেখানোর জন্য তৈরি করা বাহ্যিক রূপ—যেমন তার ধন-সম্পদ, উচ্চ পদবী বা রূপের অহমিকাকেই নিজের আসল পরিচয় ভেবে বসে,তখনই জন্ম নেয় ‘নার্সি সিজম’ বা আত্মমুগ্ধতার ব্যাধি। এই আত্মমুগ্ধতা মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দেয় যে, তার মস্তিষ্ক থেকে অন্যের দুঃখ বোঝার ক্ষমতা বা ‘এমপ্যাথি’র আলো চিরতরে নিভে যায়। সে তখন নিজের তৈরি করা এক আয়নার ঘরে বন্দী হয়ে পড়ে, যেখানে কেবলই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, অন্য কোনো মানুষের অস্তিত্ব সেখানে পৌঁছাতে পারে না।
* নৃতাত্ত্বিক বিবর্তন: আদিম অরণ্যের আদিম চিৎকার
নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অহংকার কোনো আধুনিক বিলা সিতা নয়,এটি মানুষের বেঁচে থাকার আদিম লড়াইয়ের এক অবশিষ্টাংশ। আদিম অরণ্যে যখন কোনো আইন ছিল না, রাষ্ট্র ছিল না, তখন টিকে থাকার একমাত্র শর্ত ছি—”আমি তোমার চেয়ে শক্তিশালী”।
ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’ তত্ত্বের আলোয়, শিকারী বা উপজাতি দলের নেতাকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হতো বুকের ছাতি ফুলিয়ে, শিকারের বড় বড় হাড়ের মালা গলায় পরে কিংবা শরীরে ভয়ঙ্কর ট্যাটু এঁকে। সেই দম্ভ বা অহংকার প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল অন্য গোত্রকে ভয় দেখানো এবং নিজের বংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আজ অরণ্য ফুরিয়েছে, সভ্যতার পত্তন হয়েছে; কিন্তু মানুষের জিনে রয়ে যাওয়া সেই আদিম অরণ্যের চিৎকার আজও থামেনি। আধুনিক মানুষ আজ শিকারের ট্রফি প্রদর্শন করে না ঠিকই, কিন্তু সে তার দামি গাড়ি, অট্টালিকা কিংবা ক্ষমতার দম্ভ দিয়ে আসলে সেই আদিম উপজাতি নেতার মতোই অবচেতনভাবে বলতে চায়—”আমিই শ্রেষ্ঠ, আমার কাছে আত্মসমর্পণ করো।”
* সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: পুঁজিবাদের মায়াজাল ও শোষণের হাতিয়ার
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অহংকার কেবলই কোনো ব্যক্তির মানসিক রোগ নয়, এটি সমাজের অসম কাঠামোর এক অনিবার্য উপজাত। সমাজবিজ্ঞানী থরস্টেইন ভেবলেন তাঁর বিখ্যাত‘কনস্পিকুয়াস কনসাম্পশন’ বা ‘স্থূল প্রদর্শন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে অহংকার করতে বাধ্য করে। এই সমাজে মানুষের ভেতরের নৈতিক গুণ বা মেধার চেয়ে মানুষের বাইরের আবরণ—তার ব্র্যা ন্ডের পোশাক, তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রা বেশি গুরুত্ব পায়। মানুষ তখন পণ্য কিনে কেবল নিজের প্রয়োজন মেটায় না,বরং সেই পণ্যের অহংকার দিয়ে সমাজে নিজের উচ্চ স্তর জাহির করতে চায়।
কার্ল মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে দেখলে বোঝা যায়,অহংকার হলো বুর্জোয়া বা শাসক শ্রেণীর এক ধরণের মানসিক চাবুক। সম্পদ আর ক্ষমতার এই অসম বন্টন উচ্চ বিত্তের মনে এক কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করে, যা তারা নিম্নবিত্তকে শোষণ ও শাসন করার মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সম্পদ যখন মানুষের আত্মমর্যাদার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন অহংকার হয়ে ওঠে সেই ক্ষণভঙ্গুর মর্যাদার পাহারাদার। ফলে সমাজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে জন্ম নেয় চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
* দার্শনিক সংকট: অস্তিত্বের ভয় এবং অনন্তের মায়া
দার্শনিকদের চোখে মানুষের অহংকার করার কারণ সবচেয়ে বেশি ট্রাজিক এবং একই সাথে কাব্যিক। প্রাচ্য ও ভারতীয় দর্শনের গহীন অরণ্যে প্রবেশ করলে দেখা যায়, অহংকারকে সেখানে কোনো পাপ নয়, বরং বলা হয়েছে ‘অবিদ্যা’ বা মহাজাগতিক এক ভুল। অদ্বৈত বেদান্তের ঋষিরা বলতেন, এই মহাবিশ্বে পরম সত্য কেবল একটিই—তা হলো ‘ব্রহ্ম’, যেখানে সব কিছু এক ও অভিন্ন। কিন্তু ‘মায়া’র এক জাদুকরী কুয়াশায় অন্ধ হয়ে মানুষ নিজেকে অন্য সবার থেকে আলাদা এক স্বাধীন সত্তা মনে করে বসে। সে নিজেকে ‘কর্তা’ ভেবে চিৎকার করে বলে—”এই সম্পদ আমার, এই কীর্তি আমার।”
বৌদ্ধ দর্শনের ‘অনাত্মবাদ’ (Anatta) আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বুদ্ধ বলেছিলেন, ‘আমি’ বা ‘আমার আত্মা’ বলতে স্থায়ী কিছুই নেই। মানুষ যাকে ‘আমি’ বলে অহংকার করে, তা আসলে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের—এই পাঁচটি উপাদানের এক ক্ষণস্থায়ী নদী-প্রবাহ মাত্র। এই মরীচিকার মতো ‘আমি’-কে সত্য মনে করে আঁকড়ে ধরে রাখার যে আদিম তৃষ্ণা, সেটাই অহংকার। আর এই অহংকারই মানুষের সব দুঃখের মূল কারণ।
পাশ্চাত্য দর্শনে ফ্রেডরিখ নিটশে একে মানুষের ‘ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা’ (Will to Power) হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের ভেতরে এক আদিম শক্তি আছে যা নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, ডানা মেলতে চায়।
দুর্বলরা যখন সেই শক্তির তীব্রতা সইতে পারে না, তখন তাকে ‘অহংকার’ বলে গালি দেয়। তবে অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের চোখে অহংকার হলো মানুষের এক পরম আত্মপ্রতারণা বা ‘ব্যাড ফেইথ’ (Bad Faith)। মানুষ যখন মহাবিশ্বের এই অসীম শূন্যতা, নিজের জীবনের চরম অর্থহীনতা এবং মৃত্যুর অবধারিত সত্যকে মেনে নিতে ভয় পায়, তখন সে কাঁপতে কাঁপতে এক কৃত্রিম পরিচয়, মেকি পদবী আর ক্ষমতার দম্ভকে আঁকড়ে ধরে।
সে ভাবে, এই অহংকারের দেয়াল তাকে মৃত্যু আর বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচাবে। গ্রীক মিথোলজির সেই ‘হিউব্রিস’ (Hubris) বা চরম অহংকারের ট্র্যাজেডিও তাই বলে—মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ মনে করে, নিয়তি তখনই তার পায়ের নিচের মাটি কেড়ে নেয়।
* উপসংহার: খোলস ভাঙার গান
মানুষ কেন অহংকার করে—এই প্রশ্নের উত্তর আসলে এক করুণ আত্মবিলাপের মতো। মানুষ অহংকার করে কারণ সে একা, সে ভীত, সে ভেতরে ভেতরে বড্ড শূন্য। সে যখন ভুলে যায় যে এই নক্ষত্রখচিত মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে তার অস্তিত্ব এক ফুৎকারে উড়ে যাওয়া ধূলিকণার চেয়ে বেশি কিছু নয়, তখনই সে অহংকারের এক বালির প্রাসাদ তৈরি করে। অহংকার হলো মানুষের সেই অবোধ অহমিকা, যা দিয়ে সে নিজের নশ্বরতাকে অমরত্ব দিতে চায়।
কিন্তু প্রাচ্য দর্শনের ধ্যান কিংবা আধুনিক মনস্তত্ত্বের গভীর উপলব্ধি—সবকিছুর শেষ কথা এক। অহংকার থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো নিজের এই ক্ষুদ্রত্বকে সানন্দে ও পরম শান্তিতে স্বীকার করে নেওয়া। যেদিন মানুষ তার এই কৃত্রিম ‘আমি’র খোলস ভেঙে অহংকারের প্রাসাদ ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, সেদিনই সে প্রকৃতির সাথে, মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম হতে পারে। সেই পরম শূন্যতাই তখন পূর্ণতায় রূপ নেয়, আর মানুষ খুঁজে পায় তার জীবনের প্রকৃত মুক্তি বা নির্বাণের অমৃত স্বাদ।
ছবি : মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার.