সেলিম মিয়া : দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ নেতৃত্বের দৌড় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় পাঁচ মাসের নেতৃত্বহীনতার অবসান ঘটিয়ে একজন নতুন চেয়ারম্যান ও নতুন কমিশনারদের নাম সুপারিশ করতে একটি অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি প্রাপ্ত ৩০০টিরও বেশি আবেদন যাচাই-বাছাই করছে।
দুদক, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিচার বিভাগীয় আদালতের (ঢাকা স্পেশাল জজ কোর্ট-৩) সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন চেয়ারম্যান পদের জন্য অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছেন।
বিবেচনায় থাকা অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, সাবেক জেলা জজ রুহুল কুদ্দুস, সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার, অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবদুস সবুর, সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ড. মো. আশরাফুর রহমান। এ ছাড়া নাম প্রকাশ না করে বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার নামও এই বাছাই প্রক্রিয়ায় আলোচনায় এসেছে।
মোতাহার হোসেন অতীতে দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধ বিষয়ক মামলার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেন। পরবর্তীতে দুদক উক্ত বিচারকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ এনে একটি অনুসন্ধান শুরু করলেও পরে তা নিষ্পত্তি করা হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ দেওয়া একটি সংবাদ সাক্ষাৎকারে মোতাহার দাবি করেন, মামলাটির শুনানির সময় তাকে বন্দুকের মুখে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
গত ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করার পর থেকে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য অবস্থায় রয়েছে। সংস্থাটির ২১ বছরের ইতিহাসে যা দীর্ঘতম নেতৃত্বশূন্যতা।
দুদক কর্মকর্তাদের মতে, কমিশনারদের অনুপস্থিতির কারণে প্রায় ১৩,০০০ অভিযোগ অমীমাংসিত পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান ও তদন্তের অনুমোদন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ এবং বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশের গতি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে গেছে।
এ শূন্যপদগুলো পূরণে সরকার গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। কমিটি ২ জুলাই আবেদনপত্র আহ্বান করে এবং আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৩ জুলাই। কর্মকর্তারা জানান, প্রাপ্ত ৩০০টিরও বেশি আবেদন দেশের এই দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার শীর্ষভাগে যুক্ত হতে অভূতপূর্ব আগ্রহের বার্তা বহন করে।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির কাছে সংক্ষিপ্ত তালিকা পাঠানোর আগে অনুসন্ধান কমিটি প্রার্থীদের সততা, পেশাগত দক্ষতা, প্রশাসনিক সামর্থ্য, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, জনসেবার রেকর্ড এবং দুর্নীতি দমনে তাদের প্রতিশ্রুতি বিচার-বিশ্লেষণ করছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ প্রদান করেন। আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সততা, পেশাগত দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক, একইসঙ্গে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাদের পদচ্যুত করা থেকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান গণমাধ্যমকে জানান, সংস্থাটি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, “দুদককে ঘিরে নানা ধরনের গুজব ও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। আমরা এসব বদনাম দূর করে দুদককে আরও জনগণবান্ধব করতে চাই। আমরা এটিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চাই যেন এ ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়। এ লক্ষ্যে আমরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে একসাথে কাজ করে যাব।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে ওঠার সাহস যাদের আছে, তাদেরই নির্বাচন করা উচিত। নিয়োগপ্রাপ্তদের অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ এবং কোনো স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) ছাড়া কাজ করার ধারাবাহিক প্রমাণ থাকতে হবে। বিশেষ করে দুদকের শীর্ষ তিনটি পদের জন্য এমন যোগ্য ব্যক্তি প্রয়োজন যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ও কঠোর অবস্থান নিতে পারবেন।”
ছবি : সংগৃহীত