নিজস্ব প্রতিবেদক:
পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াময় মুখ মায়ের। মা শব্দটিতে যে পরিমাণ ভালোবাসা মিশে আছে তা আর কোনো শব্দেই নেই। মায়ের জন্য ভালোবাসা অকৃত্রিম, চিরন্তন ও অনাবিল। জšে§র পর প্রথম মায়ের স্পর্শ পেয়ে দেহ-মনে শিহরণ জাগে মানবদেহের।
পৃথিবীর সভ্যতার উত্থান-পতনের যত গল্পই বলা হোক না কেন মায়ের জন্য ভালোবাসার গল্পটি সব সময় একই মমতায় মাখা থাকবে। মায়ের হাসিমুখের তুলনা চলে না অনুভূতির ভান্ডারে জমে থাকা কোনো আনন্দ বা সুখের সঙ্গে। অজস্র দুঃখ-বেদনার ঝড় সামলে রাখা সেই মমতাময়ীকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট দিনক্ষণের প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রতিটি দিনই সন্তানের জন্য মা দিবস।
মা দিবসের বিশেষ আয়োজন নিয়ে আজকের রকমারি-
‘মায়ের জন্য ভালোবাসা কোনো দিনক্ষণ মানে না; এটি অনাবিল, চিরন্তন। ’ তবুও ব্যস্ত এই পৃথিবীতে একটি বিশেষ দিন শুধু মায়ের জন্য তুলে রাখার আকুলতা মানুষের বহু পুরোনো। তবুও আজকের বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে যে ‘মা দিবস’ পালিত হয়, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংগ্রাম আর এক কন্যার অসামান্য জেদ। মা দিবসের ধারণাটি কিন্তু হুট করে আসেনি।
প্রাচীন গ্রিসে মা দিবসের আয়োজন হতো ঘরে ঘরে। তৎকালীন গ্রিসে প্রতি বসন্তকালে দেবতাদের মা ‘রিয়া’-র উদ্দেশ্যে উৎসব পালন করা হতো। মা দিবস তখন বর্তমানের মতো এতটা ব্যাপক না হলেও, সেই উদযাপনেই রোপিত হয়েছিল মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর বীজ। সপ্তদশ শতকে ব্রিটেনে মে মাসের চতুর্থ রবিবারকে ‘মাদারিং সানডে’ হিসেবে পালন করা শুরু হয়। সেদিন মানুষ মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং মায়ের জন্য উপহার কিনতেন।
এরপর আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে প্রথম মা দিবস পালন করা হয় ১৮৫৮ সালে। জুনের ২ তারিখকে তারা বেছে নিয়েছিল মা দিবস হিসেবে। তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন আমেরিকানদের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মা দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।
আবার কথিত আছে, আজ থেকে ১৫০ বছর আগের সপ্তাহের রবিবারের সকালটা অ্যানা জারভিসের জন্য একদম অন্যরকম ছিল। নিজের প্রতিষ্ঠিত সানডে স্কুলে বাচ্চাদের দিতেন বাইবেল পাঠ। এই পাঠদান কালে বাচ্চাদের জন্য তার মায়া সৃষ্টি হয়। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিজের মায়ের ছবি খুঁজে ফিরতেন। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মায়ের মুখচ্ছবিকে লালন করতে চাইলেন তিনি। এই বোধ থেকেই আধুনিক মা দিবসের গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন- মার্কিন সমাজকর্মী অ্যান জার্ভিস। তিনি ছিলেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত আমেরিকায় নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। ১৯০৫ সালে এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা জার্ভিস মায়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প করেন। তিনি চেয়েছিলেন বছরের অন্তত একটি দিন যেন পৃথিবীর সব মায়েরা বিশেষ সম্মান আর ভালোবাসা পান।
অ্যানা জার্ভিসের এই যাত্রায় অনুপ্রেরণা ছিলেন জুলিয়া ওয়ার্ডের মতো সমাজকর্মীরাও, যারা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার প্রসারে কাজ করেছিলেন। ১৯০৮ সালের ১০ মে, পশ্চিম ভার্জিনিয়া গ্রাফিটন শহরের সেই চার্চে- যেখানে তার মা একসময় পড়াতেন। অ্যানা জার্ভিস প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন। অ্যানা জার্ভিসের নিরলস চেষ্টার পর ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে সরকারি ছুটির দিন এবং ‘মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯২০ সাল নাগাদ এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং মাতৃত্বের প্রভাব ও গুরুত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি বৈশ্বিক মঞ্চ। সেই থেকে এই দিনে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে মা দিবস।
কেন এই দিনটি এত বিশেষ?
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের অন্য যেকোনো বিশেষ দিনের তুলনায় মা দিবসে সবচেয়ে বেশি ফোন কল করা হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, এই দিবসের তাৎপর্য মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে :
১. সকল মায়ের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা।
২. মাতৃত্বের সার্বজনীনতাকে সম্মান জানানো।
৩. সমাজে মায়েদের সুগভীর প্রভাবের প্রতিফলন।
মায়ের জন্য বিশেষ দিনটি আজ একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। দামি উপহার কিংবা জমকালো আয়োজন যা-ই থাকুক না কেন, দিনটির মূল কথা একটাই- পৃথিবীর প্রতিটি মায়ের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানো এবং হৃদয়ের গভীর থেকে বলা, ‘মা, তোমায় অনেক ভালোবাসি।