চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় হিসাবরক্ষক জনাব মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের বিল নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব, বিল ছাড়ের নামে ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবির অভিযোগ, অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তিদের কাছে সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সরকারি বিল নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কার্যক্রমে নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বিল, ভাউচার, বিল রেজিস্টার, হিসাব নথি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
বিল ছাড়ে ২-৩ শতাংশ অর্থ দাবির অভিযোগ”
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হচ্ছে ঠিকাদারদের বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অননুমোদিত অর্থ দাবির বিষয়টি। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ঠিকাদারের বিল অনুমোদন, স্বাক্ষর বা নিষ্পত্তির কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিলের মোট অর্থের ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট বিল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব করা কিংবা নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়’ অভিযো গের প্রকৃত সত্যতা জানতে গত কয়েক বছরের বিল, ভাউচার, বিল রেজিস্টার, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দাপ্তরিক কাজে অদক্ষতার অভিযোগ
মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে অদক্ষতার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রেজুলেশন প্রস্তুত, IMED-সংক্রান্ত প্রতিবেদন, প্রোগ্রেস রিপোর্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় দাপ্তরিক কাজে বিলম্ব ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এ অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রতিবেদন, রেজিস্টার, নথি এবং দায়িত্ব পালনের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন একই বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, মইনুল ইসলাম দীর্ঘ সময়—প্রায় ১২ বছর—রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের হিসাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তীতে বিভাগের অভিজ্ঞ বিভাগীয় হিসাবরক্ষক কাজল সাহেবকে সরিয়ে তদবিরের মাধ্যমে তিনি একই বিভাগে বিভাগীয় হিসাবরক্ষক হিসেবে পদায়ন নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে পদায়ন ও দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে প্রকৃত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট বদলি, পদায়ন, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।অধীনস্থদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে, অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং বদলি কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এর ফলে দপ্তরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পৃথক ও গোপনীয় বক্তব্য নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সংবেদনশীল তথ্য বাইরে দেওয়ার অভিযোগ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো—দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য পরিচিত কিছু ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অননুমোদিতভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি দাপ্তরিক তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
‘একক আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, অফিসে নিজের প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন মইনুল ইসলাম। অধীনস্থদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ অভিযোগের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি
অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের লিখিত ও প্রয়োজনে গোপনীয় বক্তব্য গ্রহণ;
গত কয়েক বছরের বিল, ভাউচার, বিল রেজিস্টার ও হিসাব সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা;বিল নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণ নির্ধারণ;দায়িত্ব পালনের রেকর্ড ও দাপ্তরিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা;পদায়ন, বদলি ও দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি পরীক্ষা;
অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গোপনীয় বক্তব্য গ্রহণ;
দাপ্তরিক তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে সরবরাহের অভিযোগ যাচাই;
সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রেজিস্টার ও প্রশাসনিক রেকর্ড পর্যালোচনা।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি-বিধান অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রকাশ করা হবে”
সরকারি দপ্তরের একজন হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসা জরুরি। বিশেষ করে সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিল নিষ্পত্তিতে অর্থ দাবির অভিযোগ সত্য কি না, তা নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিভাগীয় হিসাবরক্ষক জনাব মইনুল ইসলামের বক্তব্য জানা গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।