প্রথম বাংলা:জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানাধীন চুংরা পাড়া এলাকায় ২০১৮ সালে সংঘটিত ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালক হত্যাকাণ্ডের প্রায় আট বছর পর হত্যাকা ণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন আসামি মো. জালাল মিয়া (৪২), পিতা-মৃত আক্তার আলী; মো. নুর ইসলাম (৩২), পিতা-মৃত উসমান শেখ; এবং মো. মোজাম্মেল হক (৪৮), পিতা-মৃত আছান আলী, সর্বসাং- আগুনের চর, থানা- ইসলামপুর, জেলা- জামালপুর-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি জামালপুর ইউনিটের একটি চৌকস টিম গত ২৬/০৮/২০২৬ খ্রি. তারিখে জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানাধীন নাপিতের চর এলাকা থেকে জালাল মিয়াকে এবং পরদিন ২৭/০৮/২০২৬ খ্রি. তারিখে সিআইডি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকা থেকে নুর ইসলাম ও গাজীপুর কলেজ রোড এলাকা থেকে মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ০২/০৭/২০১৮ খ্রি. তারিখ দুপুরে ভিকটিম তার স্ত্রী মোছা. তাহমিনা বেগমের সঙ্গে খাবার খেয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে বকশীগঞ্জ বাজারের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। রাতে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে ইসলামপুর থানাধীন চুংরাপাড়া সাকিনস্থ পুবেরবন্দ এলাকায় একটি মৃতদেহ পড়ে থাকার সংবাদ পেয়ে ভিকটিমের স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতদেহটি তার স্বামী হিসেবে শনাক্ত করেন।
তদন্তে জানা যায়,ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৭টা ৩০মিনি ট থেকে ৮টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভিকটিমের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেও য়ার উদ্দেশ্যে তাকে কৌশলে ঘটনাস্থলে নিয়ে গলায় গাম ছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমের স্ত্রী বাদী হয়ে ইসলাম পুর থানায় মামলা নং-০২, তারিখ-০৩/০৭/২০১৮ খ্রি., ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড, ১৮৬০ রুজু করেন।
মামলা রুজুর পর ইসলামপুর থানা পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। পরবর্তীতে মামলাটির অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ১৯/০৮/২০২০ খ্রি. তারিখে মামলাটির তদন্তভার সিআইডি গ্রহণ করে। সিআইডি তদন্তভার গ্রহণের পর মামলার বিভিন্ন দিক নতুনভাবে পর্যালোচনা করে রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
সিআইডি তদন্তভার গ্রহণের পর দেখতে পায়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মামলাটির তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে জড়িতদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায়, মামলার রহস্য উদঘাটনে সিআইডি বিভিন্ন গোয়েন্দা কৌশল অবলম্বন করে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
তদন্তের একপর্যায়ে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে ভিকটিমের মোটরসাইকেলে থাকা তিনজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি সংগ্রহ করা হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় ছবিগুলো থেকে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হলেও সিআইডি বিভিন্ন মাধ্যমে ছবিগুলো প্রচার করে। এ লক্ষ্যে জামালপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাট-বাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রায় ৫,০০০ পোস্টার লাগানো হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে তাদের ছবি প্রচার করে তথ্যদাতার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এ প্রচারণার ফলে বিভিন্ন সূত্র থেকে সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে সন্দিগ্ধ ব্য ক্তিদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়।বিভিন্ন তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তা দের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা আরও যাচাই করা হয়।
একপর্যায়ে সিআইডির তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মো. জালাল, মো. নুর ইসলাম ও মো. মোজাম্মেল হক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়।
আসামিদের গ্রেপ্তারে সিআইডি জামালপুরের একাধিক আভিযানিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। কয়েক দফা অভিযান পরিচালনার পর গত ২৬/০৮/২০২৬ খ্রি. তারিখে জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানাধীন নাপিতের চর এলাকা থেকে মো. জালাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর জালালকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে এবং তার অপর দুই সহযোগী মো. নুর ইসলাম ও মো. মোজাম্মেল হক-এর সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। পরবর্তীতে জালালকে পুলিশ রিমান্ডের আবেদনসহ বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়।
জালালের দেওয়া তথ্য ও তদন্তে প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে অপর দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য সিআইডি ঢাকার বিশেষ গোয়েন্দা সহায়তা নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭/০৮/২০২৬ খ্রি. তারিখে গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকা থেকে মো. নুর ইসলাম এবং গাজীপুর কলেজ রোড এলাকা থেকে মো. মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তারা বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি লিপি বদ্ধের জন্য বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। তারা বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদান করে এবং জবানবন্দি তে তিনজনই সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য প্রদান করে। এছাড়া ভিকটিমের ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তারা প্রদান করে।
প্রায় আট বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা মামলাটির রহস্য উদ ঘাটনে সিআইডি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য, তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ, ফরেনসিক যাচাই এবং বিশেষ গোয়েন্দ তথ্য ব্যবহার করে ধারাবাহিক তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। একাধিকবার অভিযান পরিচালনার পর শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ০৩ (তিন) আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।